শনিবার, ২৩ Jan ২০২১, ১০ মাঘ ১৪২৭

করোনায় বিচারকাজ থমকে আছে

আজকের দেশবার্তা রিপোর্টঃ করোনা পরিস্থিতিতে আদালতের নিয়মিত কার্যক্রম বন্ধ। বর্তমানে ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে হাজতি-আসামিদের জামিন শুনানি, স্বাস্থ্যবিধি মেনে অধস্তন আদালতে আত্মসমর্পণ ও মামলা গ্রহণ করা হচ্ছে। তবে বন্ধ রয়েছে ফৌজদারি মামলায় অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ, যুক্তিতর্কের শুনানি ও রায় ঘোষণা। ফলে থমকে গেছে চাঞ্চল্যকর সব হত্যা মামলার বিচারকাজ।

বুয়েটছাত্র আবরার ফাহাদ, ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি, বরগুনার রিফাত শরীফ, ব্লগার ও লেখক অভিজিৎ রায় এবং প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন হত্যা মামলার মতো চাঞ্চল্যকর মামলাগুলো চলতি বছরেই নিষ্পত্তির জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু করোনা প্রাদুর্ভাবের পর এসব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও বিচারপ্রত্যাশীরা বলছেন, দ্রুত আদালতের নিয়মিত কার্যক্রম শুরু হলেও এ বছর মামলাগুলো নিষ্পত্তি হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে অগ্রাধিকারভিত্তিতে নিষ্পত্তির তাগিদ দেবেন বলে জানান তারা।

গত বছরের ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটছাত্র আবরার ফাহাদকে শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে পিটিয়ে হত্যা করে ছাত্রলীগের বিশ^বিদ্যালয় শাখার একদল নেতাকর্মী। তদন্ত শেষে মাত্র ৩৭ দিনের মধ্যে এ হত্যা মামলায় (গত বছরের ১৩ নভেম্বর) ২৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় ডিবি। বিচার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য গত মার্চে মামলাটি ঢাকা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এ স্থানান্তরিত এবং রাষ্ট্রপক্ষে মোশাররফ হোসেন কাজলকে প্রধান বিশেষ কৌঁসুলি, আব্দুল্লাহ আবু ও এহসানুল হক সমাজীকে বিশেষ কৌঁসুলি নিয়োগ দিয়ে গত ২৫ মার্চ আইনজীবী প্যানেল গঠন করে আইন মন্ত্রণালয়। গত ৬ এপ্রিল এ মামলায় অভিযোগ গঠনের শুনানির দিন ধার্য ছিল। কিন্তু নিয়মিত কার্যক্রম বন্ধ থাকায় সেটি হয়নি।

ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা মামলার রায় হয় গত বছরের ২৪ অক্টোবর। জেলার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল রায়ে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলাসহ ১৬ আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ২৯ অক্টোবর আসামিদের ডেথ রেফারেন্সের নথি এবং কারা কর্র্তৃপক্ষের মাধ্যমে জেল আপিলও হাইকোর্টে পৌঁছায়। সিরাজসহ বেশ কয়েকজন আসামি আইনজীবীর মাধ্যমে আপিল করেন। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মামলাটি শুনানির জন্য গত মার্চের প্রথম সপ্তাহে দ্বৈত বেঞ্চ গঠন করেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। আগে পেপারবুক প্রস্তুত থাকলেও করোনায় আদালত বন্ধের কারণে শুনানি হয়নি।

এ মামলার সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. বশির আহমেদ বলেন, ‘স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে মামলাটি অক্টোবরের মধ্যে নিষ্পত্তির সম্ভাবনা ছিল। এখন নিয়মিত কার্যক্রম চললে শুনানি শুরু হতে পারে। তবে এ বছরে নিষ্পত্তির কোনো সম্ভাবনা দেখছি না।’

২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি বইমেলা চলাকালে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় জঙ্গিদের হাতে খুন হন ব্লগার ও বিজ্ঞানমনস্ক লেখক অভিজিৎ রায়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অধস্তন আদালতে মামলাটি নিষ্পত্তির দিকে যাচ্ছিল। ইতিমধ্যে ১০ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। গত ২৪ মার্চ ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য থাকলেও হয়নি। অথচ এ মামলার অন্যতম সাক্ষী অভিজিতের যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী স্ত্রী বন্যা আহমেদ এবং রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে চলতি বছরেই নিষ্পত্তির প্রত্যাশা করেছিলেন। একই ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ফয়সল আরেফিন দীপন হত্যা মামলা। ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর জঙ্গিদের হাতে দীপন খুন হওয়ার প্রায় চার বছর পর ২০১৯ সালের ১৩ অক্টোবর অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়। ২৬ জনের মধ্যে ইতিমধ্যে ১৫ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন।

এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি গোলাম ছারোয়ার খান জাকির বলেন, ‘দেশে করোনা শনাক্তের কয়েক দিন আগে দুটি মামলার সর্বশেষ সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে আমরা চলতি বছরেই মামলা দুটির রায় প্রত্যাশা করেছিলাম। নিয়মিত আদালত চালু হলে মুলতবির স্থান থেকে আবার শুরু করতে হবে। ফলে এ বছর মামলা দুটি নিষ্পত্তির সম্ভাবনা নেই।’

গত বছরের ২৬ জুন বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে প্রকাশ্যে রিফাত শরীফ নামে এক যুবককে হত্যা করা হয়। গত ১ জানুয়ারি বরগুনা জেলা ও দায়রা আদালতে এ মামলায় অভিযোগ গঠন করা হয়। পরে ৭৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে গত ১০ মার্চ ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আসামিদের পরীক্ষার (আত্মপক্ষ সমর্থন) জন্য দিন ধার্য ছিল। এই প্রক্রিয়া শেষ হলে যুক্তিতর্ক ও মামলাটি রায়ের পর্যায়ে যেত। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির কারণে তা থমকে রয়েছে।

ঢাকা মহানগর দায়রা আদালতের প্রধান কৌঁসুলি এবং আবরার হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের অন্যতম আইনজীবী আব্দুল্লাহ আবু বলেন, ‘আবরার হত্যাসহ বেশ কিছু মামলা এ বছর শেষ করার জন্য এগিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু করোনা সব থমকে দিয়েছে। এর মানে আসামিরা খালাস পেয়ে যাবে, এমন নয়। সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার ও রায় হবে। একটু দেরি হলেও মামলার কোনো ক্ষতি হবে না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে অগ্রাধিকারভিত্তিতে এসব মামলার শুনানির তাগিদ দেওয়া হবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.