বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ৯ আশ্বিন ১৪২৭

নারী স্বাধীনতা আবার কী!

নিজস্ব সংবাদদাতা : কথায় কথায় আমি মা’কে জিজ্ঞাসা করলাম, আম্মা নারী স্বাধীনতা বলতে তুমি কী বোঝো? মা প্রায় তাচ্ছিল্যের সাথে উত্তর দিলেন, ‘ধুর ব্যাটা। নারী আর পুরুষের মধ্যে আবার কীসের পার্থক্য! সবাই আল্লাহর সৃষ্টি। সবাই সমান’। কাজী নজরুল ইসলামও তো একই কথা বলেছিলেন। ‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার  করিয়াছে নারী অর্ধেক নর’। আবার ধর্মীয় দৃষ্টিকোণে দেখলে কোন ধর্মেই নারী এবং পুরুষের বিশেষ কোন পার্থক্য সৃষ্টি করা হয়নি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রায় প্রত্যেক ধর্মেই নারী পুরুষের জন্য আলাদা কিছু বিধি নিষেধ রয়েছে। তবে সেটি ভিন্ন বিষয়।

সম্প্রতি যশোরের এক নারীর গায়ে হলুদ উপলক্ষে মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে নানা আলোচনা সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। কেউ এটিকে নারী স্বাধীনতার জ্বলন্ত প্রতীক হিসেবে উদাহরণ সৃষ্টি করতে চাইছেন। কেউবা এটিকে ধর্মীয় বা আইনের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করছেন। একজন ব্যক্তি নিজের বিবাহ বা ব্যক্তিগত অনুষ্ঠান কীভাবে উদযাপন করবেন সেটি নিতান্তই তার ব্যক্তিগত বিষয়। তাহলে এটি নিয়ে এতো আলোচনা বা সমালোচনা কেন?  সাম্প্রতিক সময়ে তো বটেই; কিন্তু প্রায়ই বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশে ‘নারী স্বাধীনতা’ শব্দটি শোনা যায়।  কিন্তু কেন? বা নারী স্বাধীনতা বলতে আসলেই কী বোঝায়?

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার নারী পুরুষের অনুপাত প্রায় সমান। সংবিধানের ২৮(২) অনুচ্ছেদে বলা আছে, রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষ সমান অধিকার লাভ করিবেন’। আবার পূর্বে ২৭ অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে, সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।

যশোরের সেই নারীকে নিয়ে বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নেটিজেনরা বিভিন্ন মতে বিভক্ত হয়েছেন। কেউ এটিকে নারীর অগ্রযাত্রা হিসেবে চিহ্নিত করছেন। কেউ ধর্মের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে উক্ত নারীকে নিশ্চিত জাহান্নামী বানিয়ে ফেলছেন। কেউবা আবার এটিকে বর্তমান দুর্যোগকালে তামাশা ও আইনের লঙ্ঘন হিসেবে বর্ণনা করছেন। প্রত্যেকেরই বেশ অকাট্য যুক্তি রয়েছে। কিন্তু মোটরসাইকেল শোভাযাত্রাকে নারীর অগ্রগতি বা স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করার কোনই সুযোগ নেই। কারণ আমাদের সমাজে ক্রমেই নারী মোটরসাইকেল চালকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। 

উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী রাইডার সফলতার সাথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন করছেন। নিজের খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবার এবং দেশের আর্থিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছেন। সমাজের চোখে তারা সম্মানীত। অনেক মা প্রিয় সন্তানকে স্কুলে মোটরসাইকেলে করেই আনা-নেওয়া করেন। আবার তাকে নিশ্চিত জাহান্নামী ঘোষণা করার অধিকারও কোন মানুষের নেই। সেটি নির্ধারণ করার এখতিয়ার কেবলমাত্র সৃষ্টিকর্তার। তৃতীয় পক্ষটির যুক্তি হলো প্রথমত: করোনাভাইরাসে পুরো দেশ আতঙ্কের সাগরে নিমজ্জিত হলেও তিনি আত্মীয়স্বজন নিয়ে মাস্ক ছাড়া বাইরে এমন আয়োজন করেছেন। দ্বিতীয়ত হেলমেট ছাড়া মোটর সাইকেলের বহর নিয়ে হর্ণ বাজিয়ে জনমনে আতঙ্ক ছড়ানোর পাশাপাশি যানজট সৃষ্টি করেছেন। আবার রাস্তার ভুল সাইডে গাড়িও চালিয়েছেন। এটি যদি নারী স্বাধীনতার প্রতীক হয় তবে সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ মোতাবেক এমন কর্ম অবশ্যই শাস্তির দাবি রাখে।

আসলে এসব কোনটিই প্রকৃত যুক্তি নয়। সমাজে দু-একটি ব্যতিক্রম ঘটনা ঘটতেই পারে। কিন্তু বিপত্তি ঘটেছে মোটরসাইকেল চালানোকে মাত্রাতিরিক্তভাবে নারী স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে প্রচার করায়। নারী স্বাধীনতা শব্দটিই বিদঘুটে এবং ব্যবহার করা অনুচিত। শব্দটি ব্যবহারের ফলে শ্রেণীবিন্যাসের মাধ্যমে নারীকে আলাদা করে ফেলা হচ্ছে। আবার এটি পরোক্ষভাবে এক প্রকার প্রতারণাও বটে। স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা আসে যখন কেউ পরাধীন থাকে। ইংরেজদের শাসনামলে আমরা পরাধীন ছিলাম। তখন স্বাধীনতার লড়াই করেছি। কিন্তু বর্তমানে নারীকে পরাধীনতার শিকলে বন্দী করলো কে! যুক্তিতে জয় লাভের কেউ কেউ বলতে পারেন নারীসমাজ আর্থিকভাবে অসচ্ছল। কর্মক্ষেত্র কম। পুরুষের প্রতি আর্থিকভাবে নির্ভরশীল। এটি নিতান্তই নির্বোধপূর্ণ অযৌক্তিক যুক্তি। নারীরা সেনাবাহিনী থেকে শুরু করে প্রশাসন, আদালত, শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসাসহ সর্বক্ষেত্রে সফলতার সাথে বিচরণ করছে। শিক্ষাক্ষেত্রে পূর্বে কিছু বৈষম্য থাকলেও বর্তমানে আর কোন লিঙ্গবিভেদ নেই। বরং নারীরা পুরুষের চেয়ে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করছে। তাহলে কোন ক্ষেত্রে নারীর স্বাধীনতা হরণ হচ্ছে! কোথায়বা নারীর স্বাধীনতা প্রয়োজন? আমাদের সমাজে নারী অধিকার আদায়ের আন্দোলনের নামে বেশকিছু ব্যক্তির সক্রিয় পদচারণা লক্ষ্য করা যায়। তারা মুখে নারী স্বাধীনতা বা অধিকার আদায়ের কথা বললেও পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর প্রকৃত অধিকার আদায়ের কথা কখনও বলেন না। অধিকার আদায়ের নামে এসব কথিত নারীবাদী নেতৃবৃন্দের থাকে ভিন্ন উদ্দেশ্য। কিছু অবাঞ্চিত ও বিতর্কিত বিষয়ে কথা বলে মূলত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও মিডিয়ায় লাইম লাইটে থাকার জন্য তারা এটিকে প্ল্যাটফরম হিসেবে বেছে নেন।

স্বাধীনতা শব্দটির প্রকৃত অর্থ ব্যক্তির (আইনসিদ্ধ) আত্মতৃপ্তি। বাকস্বাধীনতার অধিকার, মতামতের গুরুত্ব, নিরাপদে যেকোন স্থানে বিচরণ প্রভৃতি। তবে দেশে কাগজ কলমে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা উল্লেখ থাকলেও বাস্তবিক অর্থে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর বাস্তব চর্চা নেই। পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সকল সিদ্ধান্ত পুরুষের একক সিদ্ধান্তে বাস্তবায়িত হয়। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনে নারীদের জন্যে সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা থাকলেও সেখানে নারী কাউন্সিলরদের মতামতের কতটুকু মূল্যায়ন করা হয় সেটি কারো অজানা নয়। ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভায় গিয়ে চা নাস্তা করে চেয়ারম্যান বা কাউন্সিলরদের মতের সাথে ‘সহমত ভাই’ পোষণ করে মাস শেষে সম্মানী গ্রহণ করাই যেন সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলরদের কাজ! আবার তাদের অধিকাংশই নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন নয়; কিংবা কেউ তা করেও না। দেশের ছাত্র কিংবা বৃহৎ রাজনৈতিক সংগঠন সমূহের প্রত্যেক স্তরে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্বের কথা বলা হলেও কোন দলেই তা বিদ্যমান নেই। থাকলেও সেখানে নারীদের মতামতের গুরুত্ব নেই।

তবে আরেকটি বিষয় না বললেই নয়। এটি অস্বীকার করার জো নেই দেশের সিংহভাগ নারী অর্থনৈতিকভাবে পুরুষের প্রতি নির্ভরশীল। তবে এক্ষেত্রে নারীরা নিজেও কম দায়ী নয়। কেন যেন আমাদের দেশের নারীরা স্বেচ্ছাপরাধীন থাকতেই পছন্দ করে থাকেন। স্বামী চাকরি করবে। আমি রান্না আর সংসারের দেখভাল করব। আরেকটি বিষয় সমাজ নারীকে পরোক্ষভাবে পরাধীন করে। তবে এক্ষেত্রে সমাজের দোষ দেয়া মোটেও সমীচীন হবে না। কারণ নারী পুরুষ নিয়েই সমাজ। একজন নারী উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে পেশাগত জীবনে পদার্পণ করবে। এভাবে ব্যক্তিপর্যায়ে পরিবর্তন হলে সমাজ স্বাভাবিকভাবেই পরিবর্তন হবে। সমাজে নারী পুরুষ আলাদা করে ভাবার কোনই সুযোগ নেই। চারদিক থেকে নিজেদের প্রতি তীর ছুঁড়ে আসছে; নারীদের এই ভুল ভাবনা ভাবাও বন্ধ করতে হবে। কথিত নারীবাদীরা প্রকৃত অর্থে যে নারী স্বাধীনতা চায়, সেটি নিজেদের বিশেষ স্বার্থ সিদ্ধির জন্যেই। সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণের পাশাপাশি উভয়ের মতের সমান গুরুত্ব নিশ্চিত করতে হবে। কথিত নারীবাদীদের প্রতারণার জালে পা না দিয়ে নারী-পুরুষ একে অপরের বিরোধী বা প্রতিযোগী না হয়ে পরস্পরের সহযোগী হয়ে এগিয়ে যেতে হবে।  [মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন]

লেখক:  শিক্ষার্থী, লোক প্রশাসন বিভাগইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকবাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *