শুক্রবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০২২, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

প্রকল্পের সময় বেড়েছে এক যুগ, ব্যয় ৩০৪ থেকে ১৪৩১ কোটি

আজকের দেশবার্তা রিপোর্টঃ যে কোনো প্রকল্পই দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে বারবার তাগাদা দেওয়া হয়, যাতে করে সংশ্লিষ্টরা কম সময়ের মধ্যে সুফল পেতে পারেন। এছাড়া সময় বাড়লে প্রকল্পের ব্যয়ও বেড়ে যায়।

কিন্তু বর্তমানে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে মন্থর গতি দেখা যাচ্ছে।  

গত মঙ্গলবারও (২১ জুলাই) চলমান দুটি প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হওয়ায় ক্ষোভ ও বিরক্তি প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সব ধরনের সমন্বয়হীনতা দূর করে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি বাড়াতে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। এরপরও বিভিন্ন প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি না করে সঠিক সময়ে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের ঘটনা বিরল।  

এরকমই অতি মন্থরগতির একটি প্রকল্প ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের এলেঙ্গায় কম্প্রেসর স্টেশন স্থাপন। কেবল এক বা দুই বছর নয়, আড়াই বছর মেয়াদী এ প্রকল্প শেষ হতে সময় লেগেছে ১২ বছর। যথারীতি সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে প্রকল্পের ব্যয়ও। শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ছিল ৩০৪ কোটি টাকা। শেষমেশ তা গিয়ে ঠেকছে ১ হাজার ৪৩১ কোটি টাকায়। তারপরও শতভাগ সম্পূর্ণ হয়নি প্রকল্পের কাজ।  

জাতীয় পর্যায়ে গ্যাসের সংকট থাকলেও চালু করা যায়নি এলেঙ্গা কম্প্রেসর। অথচ আশুগঞ্জ ও এলেঙ্গায় কম্প্রেসর স্টেশন স্থাপনের প্রধান লক্ষ্য ছিল গ্যাস ট্রান্সমিশন ক্যাপাসিটি বৃদ্ধি, ভালো অপারেশন ফ্লেক্সিবিলিটি, ভালো লাইন প্যাক ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদি। বলা হচ্ছে, যথাযথ সমীক্ষা না করার কারণেই সময় ও ব্যয় বাড়ছে এ প্রকল্পের।  

সূত্র জানায়, প্রথমে ২০০৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০০৮ সালের জুন মেয়াদে এ প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নের সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু অবশেষে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত এর মেয়াদ বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে ৩০৪ কোটি ৮ লাখ টাকায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত এর ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৩০ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ, এক যুগ মেয়াদ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ব্যয় বেড়েছে অতিরিক্ত ১ হাজার ১২৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।

শুরু থেকেই এ প্রকল্পের নানা ধরনের অসঙ্গতি চিহ্নিত করেছে সরকারের প্রকল্প তদারকি সংস্থা- পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। প্রকল্পের নিবিড় পরিবীক্ষণের খসড়া প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

আইএমইডি সূত্র জানায়, দুইবার দরপত্র আহ্বান, অর্থ সংকট এবং স্কোপ অব ওয়ার্ক পরিবর্তন করে অতিরিক্ত কম্প্রেসর সংযোগের কারণে প্রকল্পের মেয়াদ বেড়েছে। ইঞ্জিনিয়ারিং নকশা, ক্রয়, নির্মাণ, স্থাপন, কমিশনিং এবং দুই বছরের অপারেশন এবং মেইন্টেন্যান্স কাজ ২০১২ সালে শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যথাসময়ে কাজ শুরু হয়নি এবং প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতি পাওয়া যায়নি। ফলে একযুগ পরও প্রকল্পের কাজ শতভাগ সম্পন্ন হয়নি। এর আওতায় ৭.০৬ হেক্টর ভূমি অধিগ্রহণ করা হলেও শেষ পর্যন্ত ওই ভূমিতে প্রকল্প স্থাপন হয়নি।

আইএমইডি’র পরিচালক (পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন সেক্টর-১ শিল্প-শক্তি) এস এম নাজিম উদ্দিন বলেন, নানা কারণে এই প্রকল্পের খরচ ও মেয়াদ বেড়েছে। এখনও জটিলতা রয়ে গেছে বন বিভাগের সঙ্গে। ফলে প্রকল্পের কাজ শতভাগ বাস্তবায়ন হয়নি। জটিলতা কাটিয়ে বিকল্প উপায়ে কাজ করা হচ্ছে। আমরা প্রকল্পটি নিয়ে সরেজমিন প্রতিবেদন তৈরি করেছি। কেন বারবার এ প্রকল্পের সময় ও ব্যয় বেড়েছে জানতে চেয়েছি। সংশ্লিষ্ট বিভাগ নানা কারণে উল্লেখ করেছে। তারপরও আমরা নির্দেশনা দিয়েছি, সঠিক সময়ে প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করতে হবে।

আশুগঞ্জ এবং এলেঙ্গায় দেড় হাজার এমএমসিএফডি এবং ৫০০ এমএমসিএফডি ক্ষমতাসম্পন্ন কম্প্রেসর স্টেশন স্থাপনের জন্য ২০০৬ সালে প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য এই স্টেশন দু’টির মাধ্যমে গ্যাস সঞ্চালন বৃদ্ধি করা। বিশেষ করে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে পিকআওয়ারে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা। নানা কারণে অর্থায়নকারী সংস্থা এশিয় উন্নয়ন ব্যাংককে (এডিবি) তাদের ঋণ তহবিল সমন্বয় করতে হয়েছে।
 
জানা যায়, দুটি কম্প্রেসর স্টেশন স্থাপনের জন্য পরপর দুই দফা টেন্ডার আহ্বান করা হয়। ২০০৬ সালের ১৬ এপ্রিল এবং ২০০৮ সালের ২৩ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেও তেমন সাড়া পায়নি বাস্তবায়নকারী সংস্থা জিটিসিএল। তবে সর্বনিম্ন দরপত্র প্রক্রিয়ার বিপরীতে সর্বনিম্ন দরদাতার উদ্ধৃত দর দাতাসংস্থা এডিবির সংস্থানকৃত পাঁচ কোটি ৫০ লাখ ডলার অপেক্ষা ১৫৩ শতাংশ বেশি। ফলে কম্প্রেসর স্টেশনগুলো স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু এডিবির চেয়ে বেশি দরে কাজ দিয়ে ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি হয় ২০১১ সালের ২১ অক্টোবর। ঠিকাদারের অনুকূলে ১০ শতাংশ অগ্রিম অর্থ প্রদান করার ফলে ৭ ফেব্রুয়ারি চুক্তি কার্যকর হয়।
 
বিলম্বের কারণ বলা হয়েছে, ইপিসি টার্ন-কি কন্ট্রাক্টর (প্রকৌশলী ডিজাইন, ক্রয়, নির্মাণ, স্থাপন, কমিশনিং এবং দু’বছরের অপারেশন ও মেইনটেন্যান্সসহ ) ২০১২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি শুরু করে। ২০১৪ সালের এপ্রিলে কম্প্রেসর স্টেশন নির্মাণ সমাপ্ত হয়। কমিশনিংয়ের জন্য সময় নির্ধারিত ছিল এক মাস। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সময় লাগে ১৭ মাস। এছাড়া প্রকল্প অঞ্চল দূরে হওয়াতে ২০১৩-১৪ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে মালামাল আনা-নেওয়ায় সমস্যা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন দুর্ঘটনাও ঘটে।

আইএমইডি বলছে, প্রকল্পটি গ্রহণ করার সময় এর বিভিন্ন অঙ্গের ব্যয় প্রাক্কলন যথাযথভাবে করা হয়নি। যার কারণে প্রাক্কলিত ব্যয় আন্তর্জাতিক বাজার দরের তুলনায় অনেক কম। ফলে কিছু ক্ষেত্রে পুনঃদরপত্র আহ্বান এবং প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি করতে হয়েছে। প্রকল্পের কর্মপরিকল্পনা এবং কাজের সুযোগ নির্ধারণে কিছুটা ঘাটতিও পরিলক্ষিত হয়। এর মূল ডিপিপিতে প্রাক্কলিত ব্যয় বাস্তবমুখী না হওয়ায় ডিপিপি বারবার সংশোধন ও ব্যয় বৃদ্ধি করতে হয়েছে। পুনঃদরপত্র আহ্বান করতে হয়েছে। এসব ঘাটতির কারণেই প্রকল্পটি যথাসময়ে শেষ করতে পারেনি বলে জানিয়েছে বাস্তবায়নকারী সংস্থা।