শুনলে অবাক হবেন ৪৬ সন্তানের মা হাজেরা!

তার চারপাশে কয়েকজন শিশু। কেউ তার গর্ভজাত নয়, কিন্তু তিনি সবার মা। এর আগেও তাকে নিয়ে ইত্তেফাকে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। তখন তিনি ছিলেন ৩৬ সন্তানের মা, এখন সংখ্যা বেড়ে ৪৬। দিনদিন সংখ্যা বাড়ছেই। বাড়বেই তো, যৌনপল্লীতে জন্ম নেওয়া শিশুর সন্ধান পেলেই ছুটে যান হাজেরা। তার কথায়, তিনি চান যৌনপল্লীতে জন্ম নেওয়া এই বাচ্চাগুলোকে যেন বাধ্য হয়ে তাদের তাদের মায়ের পেশায় না ঢুকতে হয়, অথবা অন্য কোনো অন্ধকার জগতের বাসিন্দা না হতে হয় তাই তিনি তাদের দায়িত্ব নেন। শুরু গল্পটা এখনও বারবার মনে পড়ে হাজেরা বেগমের। ২০০৮ সালের কথা। যৌনকর্মীদের সংগঠন দুর্জয় নারী সংঘে বিদেশি অর্থায়ন আসা বন্ধ হয়ে গেল। যৌনকর্মীদের সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে যা গড়া হয়েছিল তাও বন্ধ হতে লাগলো তখন। কিন্তু হাজেরা বেগম তা হতে দেননি। তিনি বলেন, ‘সেসময়ে আমার হাতে নগদ কিছু টাকা ছিল সেগুলো দিয়ে প্রাথমিকভাবে চালু রাখি প্রজেক্টটা। এরপর বিভিন্ন সহায়তা নিয়ে আড়াই বছরেরও বেশি সময় ধরে এ শিশুদের দেখভাল করি। কিন্তু এরপর কিছু ঝামেলার কারণে দুর্জয় আর টেকেনি। দুর্জয় এর পর পরাজয় মানতে পারেননি হাজেরা বেগম। ২০১০ সালের শেষের দিকে গড়ে তোলেন নতুন সংগঠন, নাম দিয়েছে ‘শিশুদের জন্য আমরা’। তার পাশে ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী। সাভারে শুরু হওয়ার সময় শিশুর সংখ্যা ছিল ২৫ জন। এরপর ক্রমাগতভাবে বাড়তে থাকে হাজেরার ছেলেমেয়ের সংখ্যা। দু’জন ছাড়া হাজেরার সব সন্তানই পড়াশোনা করে। এরমধ্যে দু’জন কলেজে পড়ে, তারা এখন হোস্টেলেই থাকে। প্রতিদিন রাতে এসে বাকিদের কোচিং করায়। ৩ জন এবার এসএসসি পরীক্ষা দেবে। হাজেরা বেগম বলেন, ‘এ আমার স্বপ্ন একটাই, এই বাচ্চারা যেন মানুষের মতো মানুষ হিসেবে এই সমাজে বেড়ে ওঠে। তারা সমাজের জন্য ভালো কিছু করে।’

কীভাবে চলছে এ সংগঠনের কার্যক্রম? প্রশ্নের জবাব দিলেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সামিউল হাসান রঞ্জু। তিনি বলেন, ‘বিদেশি বা জাতীয়ভাবে কোনো অর্থায়ন আমরা পাই না। স্থানীয় কিছু মানুষ আমাদের সবসময় সহযোগিতা করে বলেই আমাদের কার্যক্রম এখনও। চাল, ডাল, কাঁচা বাজার ও মুরগি অনেকে দেন। এছাড়াও ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা প্রতিমাসে খরচ হয় আমাদের।’

মা হাজেরার চোখে একটিই স্বপ্ন এই শিশুদের জন্য জমি কিনে একটি বাড়ি বানানো। তবে স্বপ্ন ডালপালাও মেলছে। তাই হাজেরা বলে যান, এই শিশুদের জন্য একটি স্কুল হবে, কলেজ হবে। এই শিশুদের মায়েরা বয়স্ক হয়ে গেলে যখন আর যৌন পেশায় থাকতে পারবেন না তাদের জন্য একটি বৃদ্ধাশ্রমও থাকবে। সমাজের অন্যান্যদের জন্য থাকবে আলাদা প্রজেক্ট, যাতে তারা সঠিক পথে পা বাড়াতে পারে।

হাজেরা বেগমের পুরো জীবনটাই সংগ্রামের। ৭ বছর বয়সে সত্ মায়ের নির্যাতনে বাড়ি ছাড়া। তারপর রাজধানীর পথে পথে ঘুরেছেন। রাত কাটিয়েছেন রাস্তায়। এক সময় বিক্রি হয়ে গেছেন দালালের কাছে। জীবিকার তাগিদে পতিতাবৃত্তি করতে হয়েছে একটা সময়। নিজের জীবন থেকে হাজেরা উপলব্ধি করেছেন পরিবার ছাড়া একটি শিশুর জীবন কতটা কঠিন। বেঁচে থাকাই যেখানে নিত্য চ্যালেঞ্জ সেখানে শিক্ষা যেন অনেকটা বিলাসিতার মতোই।

অন্ধকার পল্লীর বাসিন্দাদের দুঃখ-কষ্ট কতটা, তা তিনি খুব ভালোই জানেন। সেই জগতের প্রতিটি নারী চিরবঞ্চিতা। সমাজের কাছে তারা তো সম্মান পানই না, তাদের সন্তানরাও পায় না স্বাভাবিক জীবনযাপনের অধিকার। হাজেরা বেগম তাই অন্ধকার পল্লী ছেড়ে নিয়েছেন সেই জগতের বাসিন্দাদের সন্তানকে লালনপালন জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়ার উপযুক্ত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব।

সুত্রঃইত্তেফাক