বৃহস্পতিবার, ২৮ অক্টোবর ২০২১, ১৩ কার্তিক ১৪২৮

পোশাক বাণিজ্য

#তুলার ভারত নির্ভরতাকে প্রতিস্থাপন করছে আফ্রিকা# ভারতীয় তুলা থেকেও মানে ভাল#

নিজস্ব প্রতিবেদক#তুলা আমদানিতে দীর্ঘদিন ধরেই ভারতনির্ভর ছিল বাংলাদেশ। তবে এ চিত্রে পরিবর্তন আসছে। সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, তুলা আমদানির উৎস হিসেবে ধীরে ধীরে ভারতকে প্রতিস্থাপন করছে আফ্রিকার দেশগুলো। বর্তমানে দেশের আমদানীকৃত তুলার এক-তৃতীয়াংশই আসছে আফ্রিকার দেশগুলো থেকে। এর মধ্য দিয়ে দেশে তৈরি বস্ত্র ও পোশাকের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার হয়ে উঠছে আফ্রিকা।

মূলত মানের কারণেই ভারত থেকে তুলা আমদানি কমিয়ে দিচ্ছেন দেশের সুতা ও কাপড় প্রস্তুতকারীরা। তারা বলছেন, ভারতীয় তুলা থেকে উৎপাদিত কম মানের সুতা ও কাপড় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই তৈরি পোশাক ব্যবসায়ীরা অভিযোগ তুলছেন। অন্যদিকে আফ্রিকার তুলার মান তুলনামূলক অনেক ভালো। এ কারণে দেশে তুলার উৎস হিসেবে ভারতের জায়গা দখল করে নিচ্ছে আফ্রিকার দেশগুলো।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশে তুলা আমদানি হয়েছে ৭৫ লাখ বেল। এর মধ্যে পরিমাণ বিবেচনায় সবচেয়ে বড় উৎস আফ্রিকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, দেশে মোট তুলা আমদানির ১০ শতাংশ আসে আফ্রিকার বেনিন থেকে। বারকিনা ফাসো ও মালি থেকে আসে যথাক্রমে ৭ ও ৮ শতাংশ। এছাড়া আইভরি কোস্ট ও ক্যামেরুন—উভয় দেশেরই অবদান ৪ শতাংশ করে। সব মিলিয়ে দেশে আমদানীকৃত তুলার ৩৩ শতাংশ আসছে আফ্রিকা থেকে।

মূল্য ও আমদানির সময় বিবেচনায় একসময় দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস ছিল ভারত। ২০১০ সালে বাংলাদেশ মোট তুলা আমদানি করে ৫২ লাখ বেল। এর মধ্যে ভারত থেকে আমদানি হয় ১১ লাখ বেলের বেশি। এ হিসাবে সে বছর ২২ শতাংশ তুলা আমদানি হয়েছে ভারত থেকে। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ মোট ৬১ লাখ বেল তুলা আমদানি করে। এর মধ্যে ভারত থেকে আমদানি হয় ২৯ লাখ বেল তুলা। পরের বছর আমদানীকৃত তুলার মধ্যে ভারতের অংশ ছিল প্রায় ৫৫ শতাংশ। বতর্মানে এ হার কমে দাঁড়িয়েছে ২৩ শতাংশে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশে আমদানি করা তুলার ১৪ শতাংশ আসছে ব্রাজিল থেকে। একই পরিমাণ তুলা আমদানি হয় যুক্তরাষ্ট্র থেকেও। এছাড়া অন্যান্য উৎস থেকে আসে ১৬ শতাংশ তুলা।

সুতা ও কাপড় উৎপাদকদের দাবি, ভারত থেকে যে তুলা আসত তার মান কখনই সন্তোষজনক ছিল না। সে তুলনায় আফ্রিকার তুলার মান অনেক ভালো। গুণগত মান বিবেচনায় নিলে অস্ট্রেলিয়া ১ নম্বর, দ্বিতীয় যুক্তরাষ্ট্র ও তৃতীয় অবস্থানে থাকবে আফ্রিকার তুলা। এক্ষেত্রে ভারতের তুলা থাকবে তালিকার ৬ বা ৭ নম্বরে।

বিটিএমএ সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন প্রতিনিধিকে জানান, ‘বাংলাদেশের পোশাকপণ্যের কাঁচামালের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠছে আফ্রিকা। তুলা সরবরাহ চক্রে আফ্রিকার কটন অ্যাসোসিয়েশন এখন বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ অংশীদার। আমাদের মোট তুলা আমদানির উল্লেখযোগ্য একটি অংশ এখন আসছে আফ্রিকা থেকে। এ বছর তা আরো বাড়বে।’

তিনি বলেন, অর্গানিক তুলার প্রাপ্যতা ও বেটার কটন ইনিশিয়েটিভ (বিসিআই) সনদের জন্য ভারত থেকে এখনো তুলা আমদানি হচ্ছে। এ দুই বিষয় না থাকলে তুলা আমদানিতে ভারতের অংশগ্রহণ আরো কমে যেত। আফ্রিকার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার হচ্ছে। ওই অঞ্চলের কটন অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। আফ্রিকার তুলা বাণিজ্য অর্থায়নে বড় ভূমিকা রাখছে দোহাভিত্তিক ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক।

তুলা আমদানি বাণিজ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে পূর্ব ও পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোর পাশাপাশি ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র থেকেও তুলা আমদানি করা হচ্ছে। তুলার মানভেদে সুতার মানেও পরিবর্তন আসে। সে অনুযায়ী তৈরি হয় পোশাক। এক্ষেত্রে ক্রেতা যে মানের পোশাকের চাহিদা দেন, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। হাই-এন্ড বা উচ্চমানসম্পন্ন পোশাকের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল ও আফ্রিকার তুলা প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশে ভারতের তুলার চাহিদা থাকলেও তা স্থানীয় বাজারনির্ভর।

বাংলাদেশ কটন অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএ) সভাপতি সুলতান রিয়াজ চৌধুরী বলেন, অনেক সময়ই ভারত থেকে মানসম্পন্ন তুলা আনা সম্ভব হয় না। দেখা যায়, যে মানের তুলার ক্রয়াদেশ দেয়া হচ্ছে সে মানের তুলা আসছে না। বিরোধ দেখা দিলে অনেক সময় তা সমাধানে কোনো উদ্যোগ থাকে না। এসব কারণে তুলার অন্য বাজারের দিকে ঝুঁকতে হয়েছে। একক উৎসে অতিরিক্ত নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছি আমরা। আফ্রিকার পাশাপাশি ব্রাজিল থেকে তুলা আমদানি বাড়াতে চেষ্টা করছি।

বিসিএর সদস্যপ্রতিষ্ঠানগুলোও বলছে, মূল্য বিবেচনায় নিলেও ভারতের সঙ্গে অনেক বেশি তারতম্য নেই আফ্রিকার তুলায়। এক্ষেত্রে ভারতের চেয়ে দূরবর্তী দেশ হলেও মান বিবেচনায় গুরুত্ব আফ্রিকার তুলার বেশি। আরেকটি বিষয় হলো ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময়ই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না। মানহীন তুলার কারণে উৎপাদিত সুতা-কাপড়েও সমস্যা রয়ে যায়। এসব এড়াতেও ভারতীয় তুলায় নির্ভরতা অনেকটাই কমেছে।

কটন অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি মেহেদী আলী বলেন, ২০ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি বেশি হতো। এরপর পরিবহনের সময় ও তুলার দাম বিবেচনায় ভারতমুখী হতে থাকেন আমদানিকারকরা। ওড়িস্যা ও গুজরাটে উৎপাদিত ভালো মানের তুলার চাহিদা আছে। সেই মান ও প্রতিশ্রুতি বজায় রাখতে পারলে এখনো তুলা আমদানির প্রধান উৎস দেশ হিসেবেই থাকত ভারত। বিভিন্ন সময় দেশের বস্ত্র ও পোশাক রফতানিকারকদের সঙ্গে সনদপ্রাপ্তি নিয়ে ভারতীয় তুলা রফতানিকারকদের বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে। তুলা বাণিজ্যে ভারতের মতো অসততা অন্যান্য উৎস দেশের ক্ষেত্রে দেখা যায় না।

তবে আফ্রিকার বাজার থেকে তুলা সংগ্রহে সমস্যাও রয়েছে বলে জানিয়েছেন তুলা আমদানিকারকরা। তাদের মতে, আফ্রিকা থেকে অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি তুলা কেনা যায় না। ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের সহযোগিতায় এ বাণিজ্য হয়। তারা ভারতীয় ব্যবসায়ীদের তুলনায় অনেক পেশাদার। ভারতের চেয়ে ১ থেকে দেড় সেন্ট বেশি দাম হলেও মান বিবেচনায় অনেক ভালো আফ্রিকার তুলা। তবে আফ্রিকা অঞ্চলে ব্যাংকিং ব্যবস্থা এখনো উন্নত নয়। ব্যাংক খাত এগিয়ে এলে আফ্রিকার সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্পর্ক আরো দৃঢ় হবে।

আফ্রিকা থেকে আমদানি করা তুলার মান অনেক ভালো বলে মনে করেন বিকেএমইএর প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি জানান, যে তুলা দিয়ে ভালো সুতা হবে, সেই তুলার আমদানি বাড়বে। আফ্রিকার তুলার মান তুলনামূলক অনেক ভালো। গত কয়েক বছর ভারতীয় তুলার চেয়ে অন্যান্য উৎসের তুলা বেশি ব্যবহার করার কারণে আমাদের সুতার মানও ভারত ও অনেক ক্ষেত্রে চীনের চেয়েও উন্নত। এখন সময় এসেছে তুলানির্ভর পণ্যের পাশাপাশি কৃত্রিম তন্তুনির্ভর পণ্য তৈরিতে গুরুত্ব দেয়ার। এতে পোশাক রফতানির বৈশ্বিক বাজারে আমাদের অংশগ্রহণ আরো বাড়বে।

পোশাক রফতানিকারকদের দাবি, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে কৃত্রিম তন্তুনির্ভর পণ্যের চাহিদা ক্রমেই বাড়লেও বাংলাদেশের তুলার পোশাকের অংশ এখনো বেশি। এর কারণ হলো নীতিসহায়তার ঘাটতি। বাজেটে কৃত্রিম সুতা বা ম্যান মেড ফাইবার আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। যদিও বৈশ্বিক চাহিদার প্রেক্ষাপটে এটির কোনো যৌক্তিকতা নেই।

বাংলাদেশ রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক চাহিদার সঙ্গে বাংলাদেশের পোশাক সরবরাহের অসামঞ্জস্য রয়েছে। বাংলাদেশ এখনো তুলাজাত পণ্য বেশি রফতানি করছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশের মোট পোশাক রফতানির ৭৩ শতাংশ ছিল তুলার পণ্য। অন্যদিকে ২৭ শতাংশ ছিল কৃত্রিম তন্তুনির্ভর। এখনো পোশাক রফতানিতে এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। তবে বৈশ্বিক বাজার টেকসই করার ক্ষেত্রে এ চিত্র খুব দ্রুত বদলানো প্রয়োজন বলে মনে করছেন পোশাক রফতানিকারকরা।

বিজিএমইএর সহসভাপতি শহীদুল্লাহ আজিম বলেন, ‘সারা বিশ্বেই ফ্যাব্রিকের গঠন পরিবর্তন হয়ে গেছে। আগে যেখানে ৭০ শতাংশই তুলা ব্যবহার করা হতো, বর্তমানে সেখানে ৭০ শতাংশ কৃত্রিম তন্তু ব্যবহূত হচ্ছে। তুলা আর কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে একটি টি-শার্ট বানাতে একই সময় লাগে। কিন্তু কৃত্রিম তন্তুর ক্ষেত্রে দাম বেশি পাওয়া যায়। এতে রফতানি মূল্য বেড়ে যায় ২০-৩০ শতাংশ। এক্ষেত্রে নতুন করে কারখানা করার প্রয়োজন নেই। শুধু কিছু উন্নত মানের যন্ত্রপাতি প্রয়োজন। সরকার যদি এ ধরনের ফ্যাব্রিক ব্যবহার করে রফতানির ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ প্রণোদনা ঘোষণা করে, তাহলে সবাই এতে এগিয়ে আসবে। ভিয়েতনাম এগুলো ব্যবহার করে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদেরও সেদিকেই যেতে হবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.