মঙ্গলবার, ০৯ আগস্ট ২০২২, ২৫ শ্রাবণ ১৪২৯

আট মাসেও কোনো জাহাজ রপ্তানি হয়নি

নিজস্ব সংবাদদাতা : রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনার হাতছানি নিয়ে আশা জাগিয়েছিল যে জাহাজ রপ্তানি, তা তছনছ করে দিয়েছে মহামারী করোনাভাইরাস।

গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে জাহাজ রপ্তানি থেকে বাংলাদেশ এক কোটি ১৩ লাখ ২০ হাজার ডলার আয় করেছিল। বিশ্ব বাজারে সম্ভাবনা থাকায় চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা প্রায় দ্বিগুণ বাড়িয়ে এক কোটি ৮০ লাখ ডলার ধরা হয়।

কিন্তু অর্থবছরের প্রথম চার মাসে অর্থাৎ জুলাই-অক্টোবর সময়ে এক টাকার জাহাজও রপ্তানি হয়নি। শুধু তাই নয়, মার্চে মহামারী শুরুর পর আট মাসেও কোনো রপ্তানি হয়নি।

দেশের সবচেয়ে বড় জাহাজ নির্মাতা ও রপ্তানিকারক ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডের চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম বুধবার এ প্রতিবেদককে বলেন, “সব শেষ…। গত আট মাসে কোনো জাহাজ রপ্তানি করতে পারিনি আমরা। শুধু আমরা নয়, কেউই কোনো জাহাজ রপ্তানি করেনি।

“বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনার হাতছানি নিয়ে এসেছিল যে জাহাজ নির্মাণ শিল্প, কোভিড-১৯ তা একেবারে তছনছ করে দিয়েছে।”

বেশ কিছুদিন ধরে সমুদ্রকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জোর দিচ্ছে বিশ্বের উপকূলীয় দেশগুলো। সমুদ্র থেকে মৎস্য ও খনিজ সম্পদ আহরণ, সামুদ্রিক নবায়নযোগ্য শক্তি, সামুদ্রিক পর্যটন, সমুদ্র নিরাপত্তা ও গবেষণা ঘিরে বাড়ছে এসব কর্মকাণ্ড। সমুদ্র অর্থনীতির এসব কর্মকাণ্ডের জন্য দরকার উচ্চ প্রযুক্তির বিশেষায়িত ছোট-বড় জাহাজ।

পণ্যবাহী জাহাজ রপ্তানির বাজারের মতো উত্থান-পতন নেই উচ্চ প্রযুক্তির বিশেষায়িত জাহাজের রপ্তানির বাজারে। তাই সম্ভাবনাময় এই রপ্তানির বাজার ঘিরেই আগ্রহ বেড়েছিল বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর।

সরকারও এ খাতের রপ্তানি বাড়াতে নানা ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। রপ্তানিকারকদের নগদ সহায়তা, কর ছাড়সহ নানা প্রণোদনা দিচ্ছে সরকার। ব্যাংকগুলোও মোটা অংকের অর্থায়ন করেছে এই খাতে। একটি নীতিমালা তৈরির কাজও শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

খসড়া নীতিমালায় জাহাজ রপ্তানি থেকে বছরে ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার আয় হবে বলে প্রত্যাশা করা হয়েছে।

এক যুগ আগে ২০০৭ সালে সাধারণ পণ্যবাহী জাহাজ রপ্তানির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে জাহাজ রপ্তানি খাতের যাত্রা শুরু হয়েছিল। জার্মানিতে জাহাজ রপ্তানির ফলে বৈশ্বিকভাবে বাংলাদেশ সম্পর্কে এমন একটা বার্তা যায় যে, দেশটি বিশেষায়িত এই শিল্পে দক্ষতা অর্জন করেছে। এতে দেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি সৃষ্টি হয়। কিন্তু ২০০৮ সালে শুরু হওয়া বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং ২০১০ সালে ইউরো জোনের মন্দার কারণে সেই সম্ভাবনা কাজে লাগানো যায়নি। কারণ সমুদ্রগামী জাহাজের ৭০ ভাগের মালিকানা ইউরোপের দেশগুলোর। ওই সময়ে ইউরোপের ব্যাংকগুলো জাহাজ কেনায় অর্থায়ন বন্ধ রাখে। জাহাজ ভাড়াও ৭৫ শতাংশ কমে যায়।

রপ্তানিমুখী জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড শিপ বিল্ডিং ইন্ডাস্ট্রিজ অব বাংলাদেশের (এইওএসআইবি) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি সাইফুল বলেন, “যে সময় জাহাজ রপ্তানি ‘টেক অফ’ করবে, সেই সময়ই ওই ধাক্কা আসে। ২০১০ সালের পর থেকে আমরা ‘টুকটাক’ করে ঘুঁরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে আসছিলাম। আমরা ঘুঁরে দাঁড়িয়েছিলামও। এ বছরের শুরুতে ভারতের জিন্দাল স্টিল ওয়ার্কস চারটি আট হাজার টনের জাহাজ নিয়েছে।

“এই রপ্তানির মধ্য দিয়ে আমরা প্রমাণ করেছি, বাংলাদেশ শুধু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যই উৎপাদন করে তা নয়, উচ্চ প্রযুক্তির ভারী শিল্পপণ্যও এখানে তৈরি হচ্ছে। জার্মানি, ডেনমার্ক, নিউজিল্যান্ড, কেনিয়া, পাকিস্তান ও ভারতে ইতোমধ্যে জাহাজ রপ্তানি হয়েছে। এসব জাহাজের মধ্যে পণ্যবাহী জাহাজের পাশাপাশি যাত্রীবাহী, বহুমুখী ব্যবহারের উপযোগী, মাছ ধরার জাহাজ এবং যুদ্ধজাহাজও ছিল।

‘কিন্তু কোভিড-১৯ সব কিছু শেষ করে দিয়েছে’ জানিয়ে সাইফুল বলেন, “আমরা যখন জাহাজ তৈরি করি, তখন যে প্রতিষ্ঠানের জাহাজ তৈরি করি সেই প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি উপস্থিত থাকেন। এমনকি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত থাকেন। মার্চের পর থেকেই তারা চলে গেছেন। আমাদের সব কাজ বন্ধ।”

“আমাদের মোট রপ্তানির ৭০ শতাংশই রপ্তানি হয় ইউরোপের দেশগুলোতে। সেখানে করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ দেখা দেওয়ায় সংকট আরও বেড়েছে। কমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে; কবে থেকে আবার রপ্তানি শুরু হবে; সেই রপ্তানির সম্ভাবনা অদৌ ফিরে আসবে কিনা- সবকিছুই এখন অনিশ্চত।”

এইওএসআইবির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের মাত্র দুটি-তিনটি প্রতিষ্ঠান জাহাজ রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। তবে রপ্তানি করতে সক্ষম এমন কারখানা আছে দেশে ১০টি। এরমধ্যে দেশে ব্যবহারের জন্য বিশেষায়িত জাহাজ নির্মাণ করে ইতোমধ্যে দক্ষতা দেখিয়েছে বেশ কয়েকটি কারখানা। দেশের জন্য তৈরি করা হলেও এসব জাহাজ নির্মাণে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে হয়েছে কারখানাগুলোকে।

এ ছাড়া কর্ণফুলী শিপইয়ার্ড লিমিটেড নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে তিনটি কারখানায় খননকারী জাহাজ (ড্রেজার) নির্মাণ করছে।

বেসরকারি খাত ছাড়াও নৌবাহিনী পরিচালিত তিনটি ইয়ার্ডও নিজেদের ব্যবহারের জন্য যুদ্ধজাহাজসহ বিশেষায়িত জাহাজ নির্মাণে সক্ষমতা দেখিয়েছে।

আবার দেশে উচ্চ প্রযুক্তির বিশেষায়িত জাহাজ ‘এলপিজি ক্যারিয়ার’ নির্মাণ করেছে রেডিয়েন্ট শিপইয়ার্ড লিমিটেড। তিনটি জাহাজ নির্মাণ করে হস্তান্তরও করেছে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের দাউদপুরের এই জাহাজ নির্মাণ কারখানাটি। ফিশিং ট্রলারসহ আরও কয়েক ধরনের বিশেষায়িত জাহাজ তৈরি করে এই শিপইয়ার্ড।

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের তথ্য অনুযায়ী, জাহাজ নির্মাণ খাতে নেতৃত্ব দিচ্ছে চীন, কোরিয়া ও জাপান। বিশ্বের মোট জাহাজ নির্মাণের ৯০ দশমিক ৫ শতাংশ হয় এই তিনটি দেশে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জাহাজ রপ্তানি থেকে ৪৭ লাখ ৩০ হাজার ডলার আয় করেছিল বাংলাদেশ।

গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে এ খাত থেকে রপ্তানির লক্ষ্য ধরা হয় ৫০ লাখ ডলার। বছর শেষে সেই লক্ষ্য থেকে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ১ কোটি ১৩ লাখ ২০ হাজার ডলার দাঁড়ায়, যা ছিল এ যাবতকালে জাহাজ রপ্তানি থেকে সবচেয়ে বেশি আয়।

গত অর্থবছরে আগের বছরের চেয়ে রপ্তানি বেড়েছিল ১৪০ শতাংশ।

সেই ধারাবাহিকতায় চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে এ খাত থেকে আয়ের লক্ষ্য ধরা হয় ১ কোটি ৮০ লাখ ডলার।

ইপিবি’র তথ্যে দেখা যায়, অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) ৫ হাজার ডলারের জাহাজ রপ্তানি হয়েছে। যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৭০ দশমিক ৫৯ শতাংশ এবং লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৯৯ দশমিক ১১ শতাংশ কম।

এই তথ্য বিশ্লেষণ করে সাইফুল ইসলাম বলেন, “এই চার মাসে আসলে কোনো জাহাজ রপ্তানি হয়নি। আগে রপ্তানি করা জাহাজের অর্থ দেশে এসেছে।”

ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডের কর্ণধার সাইফুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ এখনও পর্যন্ত ছোট ও মাঝারি মানের সমুদ্রগামী জাহাজ তৈরি করে। বিশ্বব্যাপী এ ধরনের জাহাজের চাহিদা বেশি, যার বাজার ২৫০ বিলিয়ন ডলারের মতো। বাংলাদেশে যে ১০টি শিপইয়ার্ড রয়েছে তারা আগামী তিন বছরে এক বিলিয়ন ডলার মূল্যের জাহাজ রপ্তানির সক্ষমতা রাখে। উন্নত প্রযুক্তির জাহাজ নির্মাণের দক্ষ জনবলও দেশে রয়েছে।